রোজার মাসলা-মাসায়েল, ইফতারের দোয়া ও শবে কদর
রমজান মাস রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এই মাস অনেক বরকতের মাস। এই মাসে মহান আল্লাহ তাআলা তার অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এই মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব অনেক বেশি। এ ব্লগে আমরা রোজার মাসলা-মাসায়েল, ইফতারের দোয়া, রোজার নিয়ত, শবে কদর ও আরো অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানব।

রোজা সম্পর্কে কোরআনের বাণী
রোজা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন:
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ.
O you who have believed, decreed upon you is fasting as it was decreed upon those before you that you may become righteous –
Bengali – Bayaan Foundation
হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।
Bengali – Mujibur Rahman
হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমাদের পূর্ববতী লোকদের ন্যায় তোমাদের উপরও সিয়ামকে অপরিহার্য কর্তব্য রূপে নির্ধারণ করা হল যেন তোমরা সংযমশীল হতে পারো।
(রেফারেন্স: সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৩)
রোজা সম্পর্কে হাদিসের বাণী
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنِ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم قَالَ “ مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ ”. قَالَ أَحْمَدُ أَفْهَمَنِي رَجُلٌ إِسْنَادَهُ.
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোক মিথ্যা কথা এবং সে অনুসারে কাজ করা আর মূর্খতা পরিহার করলো না, আল্লাহর নিকট তার পানাহার বর্জনের কোন প্রয়োজন নেই। (আ.প্র. ৫৬২২, ই.ফা. ৫৫১৮) আহামাদ (রহঃ) বলেছেন, এক ব্যক্তি আমাকে এর সূত্র জ্ঞাত করেছেন।
(রেফারেন্স: সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৫৭)
ইফতারের দোয়া
ইফতারের দোয়া আরবি
ذَهَبَ الظَّمَاءُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الْأَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ.
ইফতারের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
জাহাবাজ জামা-উ; ওয়াবতাল্লাতিল উ’রুকু; ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
অর্থ : (ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো।
(রেফারেন্স: আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৭)
ইফতারের দোয়া সম্পর্কে হাদিস
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى أَبُو مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْحَسَنِ، أَخْبَرَنِي الْحُسَيْنُ بْنُ وَاقِدٍ، حَدَّثَنَا مَرْوَانُ، – يَعْنِي ابْنَ سَالِمٍ – الْمُقَفَّعُ – قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عُمَرَ يَقْبِضُ عَلَى لِحْيَتِهِ فَيَقْطَعُ مَا زَادَ عَلَى الْكَفِّ وَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَفْطَرَ قَالَ “ ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ ” .
মাওয়ান ইবনু সালিম আল-মুকাফফা‘ (রহঃ) থেকে বর্ণিত:
আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ) -কে তার দাড়ি মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে মুষ্টির বাড়তি অংশ কেটে ফেলতে দেখেছি। আর তিনি বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইফতারের সময় বলতেনঃ ‘পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ প্রতিদানও নির্ধারিত হয়েছে’। (রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৩৫৭)
যে সব কারণে রোজা না রাখার অনুমতি আছে
- কঠিন রোগাক্রান্ত হলে বা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে।
- গর্ভবতী মহিলা বা গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হলে।
- দুগ্ধপোষ্য সন্তানের জননী রোজা রাখলে সন্তানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা হলে।
- সফরে থাকলে।
- বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে।
- হায়েয বা নেফাস হলে (পরবর্তীতে কাযা আদায় করতে হবে)।
জেনে রাখা প্রয়োজন যে, বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে প্রত্যেকটি রোজার পরিবর্তে সদকায়ে ফিতর পরিমাণ ফিদিয়া দিবে বা একজন মিসকিন কে দুবেলা পেট ভরে খানা খাওয়াবে তবে শক্তি ফিরে আসলে রোজা গুলো কাযা করতে হবে।
যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়
- পানাহার করলে (তবে ভুলক্রমে পানাহার করলে রোজা ভঙ্গ হয় না)।
- নাকে বা কান তেল, ঔষধ প্রবেশ করালে।
- ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে।
- মুখে বমি আসার পর তা গিলে ফেললে।
- কুলি করার সময় পানি গলার ভিতরে ঢুকে পড়লে।
- দাঁতে আটকে থাকা খাবার ছোলা পরিমাণ বা তার চেয়ে বড় ধরনের খাদ্য কনা গিলে ফেললে।
- মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে পড়লে এবং সুবহে সাদিকের পর জাগ্রত হলে।
- ইচ্ছাকৃতভাবে লোবান, আগরবাতি ও সুগন্ধি দ্রব্যের ধোঁয়া গলাধঃকরণ করলে বা নাকের মধ্যে টেনে নিলে।
- স্ত্রী সহবাস করলে।
- রাত বাকি আছে মনে করে সুবহে সাদিকের পর সেহরি খেলে।
- সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছে মনে করে সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতার করলে।
- ইনহেলার নিলে আরো অন্যান্য।
যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না
- অনিচ্ছাকৃতভাবে গলার ভিতর ধুলা-বালি, ধোঁয়া অথবা মশা-মাছি প্রবেশ করলে।
- অনিচ্ছাকৃতভাবে কানে প্রবেশ করলে।
- অনিচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি আসলে অথবা ইচ্ছাকৃত অল্প বমি করলে (মুখ ভরে নয় এমন)।
- চোখে ঔষধ বা সুরমা ব্যবহার করলে।
- ইনসুলিন বা ইনজেকশন নিলে।
- রোজার কথা মনে না থাকা অবস্থায় পানাহার করলে।
- সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করলে।
- কোন কিছুর ঘ্রাণ নিলে।
- নিজের মুখের থুথু গিলে ফেললে।
- শরীর ও মাথায় তেল ব্যবহার করলে।
- ঠান্ডার জন্য গোসল করলে।
- দিনের বেলায় স্বপ্নদোষ হলে।
- মেসওয়াক করলে।
আরও পড়ুন: কুরআন ও হাদিসের আলোকে ভালো মানুষদের গুণাবলী
শবে কদর
শবে কদর অতি মূল্যবান রাত। রমজানের শেষ দশ দিনের যেকোনো বিজোড় রাতে শবে কদর হতে পারে। শবে কদরের এক রাত্রে ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। অতএব শেষ দশকের বেজোড় রাত্রি গুলোতে বিশেষভাবে অধিক ইবাদাত করা উচিত।
শবে কদরের দোয়া
শবে কদরের বেশি বেশি এই দোয়া পড়া উত্তম
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي.
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’
শবে কদর সম্পর্কে হাদিস
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ كَهْمَسِ بْنِ الْحَسَنِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ وَافَقْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ مَا أَدْعُو قَالَ “ تَقُولِينَ اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي ” .
আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তবে কি দুআ’ পড়বো? তিনি বলেনঃ তুমি বলবে, “হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, তুমি ক্ষমা করতেই ভালোবাসো। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও”।
(রেফারেন্স: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৮৫০)



