কিয়ামতের কঠিন দিনে যখন কোনো ছায়া থাকবে না, তখন মহান আল্লাহ ৭ শ্রেণির মানুষকে তাঁর আরশের নিচে ছায়া দেবেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফের সহীহ হাদীসের আলোকে জেনে নিন সেই সৌভাগ্যবান কারা এবং কীভাবে আপনিও সেই তালিকায় নাম লেখাতে পারেন। যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এই প্রবন্ধে।
আল্লাহর ছায়া ছাড়া কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সূর্য একেবারে মানুষের মাথার উপরে অবস্থান করবে। মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। সূর্যের প্রখর তাপে মানুষ তার শরীর থেকে নির্গত ঘামে সাঁতার কাটতে থাকবে। নবী কারীম (সাঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন সীমাহীন কঠিন অবস্থার মধ্যেও মহান আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণীর লোককে তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন। যেদিন তার ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।

আরশের ছায়া অবস্থানকারীদের সম্পর্কে হাদিস
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي خُبَيْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ حَفْصِ بْنِ عَاصِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ تَعَالَى فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَدْلٌ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ”.
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে দিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না, সে দিন আল্লাহ তা’আলা সাত প্রকার মানুষকে সে ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক। (২) যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের ভিতর গড়ে উঠেছে। (৩) যার অন্তরের সম্পর্ক সর্বদা মসজিদের সাথে থাকে। (৪) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে দুব্যক্তি পরষ্পর মহব্বত রাখে, উভয়ে একত্রিত হয় সেই মহব্বতের উপর আর পৃথক হয় সেই মহব্বতের উপর। (৫) এমন ব্যক্তি যাকে সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী (অবৈধ মিলনের জন্য) আহবান জানিয়েছে। তখন সে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। (৬) যে ব্যক্তি গোপনে এমনভাবে সদকা করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাত তা জানতে পারে না। (৭) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাতে আল্লাহর ভয়ে তার চোখ হতে অশ্রু বের হয়ে পড়ে।
[রেফারেন্স: সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৪২৩, হাদিসের মান: সহিহ হাদিস।]
আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন যারা/যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে
- ন্যায়পরায়ণ বাদশা।
- ঐ যুবক যে তার যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে।
- ঐ ব্যক্তি যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে।
- ঐ দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে।
- ঐ ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী কু প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রস্তাব দেয়। আর তখন সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি।
- ঐ ব্যক্তি যে এমন গোপনতার সাথে দান করে তার বাঁ হাত ও জানেনা যে তার ডান হাত কি দান করে।
- যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে।
ন্যায়পরায়ণ শাসক
আল্লাহ তাআলা যে সাত শ্রেণীর মানুষকে তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন তাদের মধ্যে ন্যায় পরায়ণ শাসক এর অবস্থান হাদিসে প্রথমে এসেছে। অর্থাৎ, দুনিয়াতে যে ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ ভাবে শাসন কার্য পরিচালনা করেছে তাকে আল্লাহ তা’আলা তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন। এ শাসন হতে পারে রাষ্ট্রীয় সমাজে ঘরে বাইরে যেকোনো জায়গায়।
আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন যুবক (ওই যুবক যে তার যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে)
কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ওই যুবককে তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন যে যুবক তার যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভের জন্য ইবাদত বন্দেগী করেছেন।
মসজিদের প্রতি যার অন্তর লেগে থাকে (ওই ব্যক্তি যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে)
হাদিসে আরশের ছায়ায় স্থান পাওয়া তিন নাম্বারে সেই ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যে ব্যক্তির অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোন এক নামাজ পড়ে আসার পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব স্থাপনকারী দুই ব্যক্তি
(ওই দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে)। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাউকে ভালবাসলে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন সেই দুই ব্যক্তিকে তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন।
যেনা-ব্যভিচার থেকে নিজেকে রক্ষা করা যুবক
আল্লাহ তাআলা ওই যুবককে তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন যে যেনা-ব্যভিচার থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে। কোন সুন্দরী মহিলা কু-প্রবৃত্তির মাধ্যমে তাকে ডাকলে সে তার থেকে বিরত থেকেছে এই ধরনের যুবককে আল্লাহ তা’আলা তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন। অর্থাৎ ওই যুবক যাকে কোন সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী কু-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রস্তাব দেয়। আর তখন সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি।
দানশীল ব্যক্তি
আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাওয়া সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন হল আল্লাহর রাস্তায় দানকারী ব্যক্তি। কিভাবে আল্লাহর রাস্তায় দান করে যে তার ডান হাত দান করলে বাম হাত তা জানতে পারেনা। অর্থাৎ, ওই ব্যক্তি যে খুবই গোপনে আল্লাহর রাস্তায় দান করে। এই ধরনের ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন।
আল্লাহকে স্মরণকারী ব্যক্তি
আল্লাহ তাআলা তার আরশের ছায়া যাদের স্থান দিবেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হল যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার এমন বান্দা যিনি গোপনে আল্লাহকে স্মরণ করেন আর তার স্মরণের সময় তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে।
আরও পড়ুন: ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ বা ঈমান ভঙ্গের ১০ কারণ
মন্তব্য
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি মহান আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণীর মানুষের জন্য কেয়ামতের দিন তার আরশের ছায়ায় স্থান দেয়ার কথা বলেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা এই সাত শ্রেণীর কোন এক শ্রেণী হতে আমাদের কবুল করুন। আমীন।



